বাংলাদেশে পুনরুত্থিত ধর্মীয় উগ্রবাদের ছায়া: মৌলবাদ-বিরোধী মতপ্রকাশের জের ধরে এমনকি প্রগতিশীল বিএনপির নেতা-কর্মী-সাংবাদিকের বাড়িতে হামলা
দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর বিভিন্ন অঞ্চলে একাধিক লেখক ও ব্লগারের বাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিশেষ করে ধর্মীয় উগ্রবাদ ও মৌলবাদবিরোধী লেখালিখির এবং মতপ্রকাশের কারণে তারা টার্গেট হচ্ছেন। তবে এসব হামলার ব্যাপকতা থাকলেও তা প্রচারের আলো পাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন বিভিন্ন মহল।
অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশে স্থিতিশীলতা ফেরানোর চেষ্টা করছে। একই সাথে বিএনপি এবং জামায়াত এর রাজনীতিতে পুনর্বাসন হয়েছে। কিন্তু মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলোর পুনরুত্থান এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আঘাত একটি নতুন সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিগত কয়ের মাসের ব্যবধানে দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলার উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর মধ্যে যুক্তরাজ্য যুবদলের যুগ্ম সম্পাদক শাহরিয়ার মোঃ নাফিস খান দীর্ঘদিন ধরে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। ইসলামী মৌলবাদীদের কার্যক্রমের বিরুদ্ধে লেখালেখি করায় গত ২ মার্চ কতিপর দুর্বৃত্তকারী তার ঢাকার মালিবাগের বাসায় হামলা চালানো হয়। হামলাকারীরা তার বাড়িতে ব্যাপক ভাঙচুর করে এবং তার বাবা নজরুল ইসলাম খান আহত হন, যার ফলে তাকে স্থানীয় ক্লিনিকে চিকিৎসা নিতে হয়। এর আগেও একাধিকবার এরা হানা দিয়েছে বলে জানা যায়।
এছাড়াও, যুক্তরাজ্য যুবদলের আরেক যুগ্ম সম্পাদক ও লেখক মুকিত চৌধুরীর হবিগঞ্জের জামালখান সড়কের বাসায় গত ২৭ ফেব্রুয়ারি হামলার ঘটনা ঘটে। হামলায় তার বড় ভাই এনামুল চৌধুরী আহত হন। মুকিত চৌধুরী ইসলামী মৌলবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার একজন বিএনপি নেতা হিসেবে পরিচিত। জাতীয়তাবাদী ধারার লেখক, ব্লগার ও সাংবাদিক গাজী মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের উত্তর গোরান, সিপাহীবাগের বাসায়ও একাধিকবার হামলা চালানো হয়েছে। সর্বশেষ গত ৩ মার্চ তার পরিবারের সদস্যদের লাঞ্ছিত করা হয় এবং তার পিতা এ কে এম শফিকুল ইসলাম আহত হন। রাজশাহীর বাঘা থানা বিএনপির পৌর সম্পাদক মিজানুর রহমানের দক্ষিণ মিলিক বাঘার বাড়িতেও গত ৪ মার্চ হামলা চালানো হয়। হামলাকারীরা বাড়িতে ব্যাপক ভাঙচুর চালানোর পাশাপাশি তার ছোট ভাই শাহিনুর রহমানের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটায়।
হামলার শিকার ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও সাম্প্রতিক হামলাগুলো রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের বাইরে গিয়ে মানবিক নিরাপত্তার সংকটে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে আক্রান্ত ব্যক্তিরা ইসলামী মৌলবাদীদের কার্যক্রমের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন এবং তাদের লেখা “এথিস্ট ইন বাংলাদেশ,” “এথিস্ট নোট,” ও “দৈনিক নবযুগ”-এর মতো বিতর্কিত অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত হয়েছে। এসব প্ল্যাটফর্ম ইসলামী বিভিন্ন গোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের বিরোধিতার শিকার বলে জানা গেছে।
হামলার শিকার পরিবারের সদস্যরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তারা থানায় অভিযোগ দায়েরের চেষ্টা করলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তা গ্রহণ করতে অনীহা দেখিয়েছে। এতে তারা আরও বেশি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। ক্রমাগত হামলার কারণে এসব পরিবার আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। এ অবস্থায় বিএনপির কিছু নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, দল পুনর্বাসিত হলেও উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কারণে অনেকেই চাপে পড়ছেন। এক বিএনপি নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে ফিরে এসেছি, কিন্তু উগ্রবাদবিরোধী অবস্থান নেওয়া সত্ত্বেও দলের ভেতরের অনেকেই এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। এসব ঘটনা বন্ধ হওয়া দরকার।”
জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এই লেখক, ব্লগারদের ওপর ধারাবাহিক হামলার ঘটনা উদ্বেগজনক। আক্রান্ত পরিবারগুলো তাদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চেয়ে প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ দাবি করেছে। একই সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে।