Thursday, 19/10/2017 | 4:22 UTC+6
দৈনিক বাংলাদেশ

মধ্যরাতের রুদ্ধশ্বাসঅভিযান

কোথাও বিদ্যুৎ নেই। সড়কের সোডিয়াম বাতিগুলোও নেভানো। ঘুটঘুটে অন্ধকার। পায়ের নিচে ইট, পাথর, ভাঙা কাচ। এখানে-সেখানে গাড়ির পোড়া কাঠামো। ভুতুড়ে পরিবেশ। পথ চলতে ভরসা সেলফোনের আলো।এর মধ্যে হঠাৎ গুলির শব্দ। একটি-দুটি নয়, মুহুর্মুহু। সঙ্গে কাঁদানে গ্যাসের সেল, আর গ্যাস গ্রেনেডের কানফাটা আওয়াজ। প্রথমে ১০ মিনিট চলল এভাবে। একটু থেমে আরও ২০ মিনিট চলে একইভাবে। এরপর চারদিকে বেজে ওঠে হুইসেল। নিয়ন্ত্রণকক্ষে খবর যায়, হেফাজতে ইসলামের লোকজন পালিয়ে গেছে। দিনভর লাখো মানুষে উত্তাল শাপলা চত্বর ফাঁকা। এই হলো রোববার দিবাগত রাত তিনটা থেকে পরবর্তী ৩০ মিনিটের এক পরিকল্পিত অভিযানের ফল।৩০ মিনিটের এই অভিযানের প্রস্তুতিতে সময় লাগে পাঁচ ঘণ্টারও বেশি। অংশ নেওয়া একাধিক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা ধারণা করেছিলেন, বায়তুল মোকাররম এলাকায় দিনভর যে তাণ্ডব চলছিল, রাত নামলে তা থেমে যাবে। এ জন্য হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফীকে দিয়ে কর্মীদের মতিঝিল ছেড়ে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়ারও প্রস্তাব করেছিলেন তাঁরা। কিন্তু আমির সমাবেশে রওনা হয়ে মাঝপথ থেকে ফিরে তাঁর ঢাকার অবস্থান লালবাগে যাওয়ায় পরিস্থিতি পাল্টে যায়। হেফাজতের কর্মীরা শাপলা চত্বরে অনির্দিষ্টকালের জন্য অবস্থান নেন।

এরপর সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়, যেভাবেই হোক শাপলা চত্বর খালি করতে হবে।

পুলিশ সদর দপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, রাত ১০টায় পুলিশের মহাপরিদর্শক আবদুল গনি সড়কের নিয়ন্ত্রণকক্ষে বৈঠক ডাকেন। ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার, সব বিভাগের উপকমিশনার, র‌্যাব ও বিজিবির কর্মকর্তারা তাতে অংশ নেন। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, অভিযানের প্রস্তুতি শুরু হবে রাত ১২টায়।

র‌্যাবের গোয়েন্দাপ্রধান লে. কর্নেল জিয়াউল আহসান বলেন, প্রথমে পরিকল্পনা ছিল তিন দিক থেকে শাপলা চত্বরে অভিযান হবে। পরে বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, তিন দিক থেকে অভিযান করলে লোকদের সরে যাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যাবে। এ কারণে দুই দিক থেকে অভিযানের সিদ্ধান্ত হয়। যাত্রাবাড়ীর দিকটা খোলা রাখা হয় হেফাজতের কর্মীদের নিরাপদে সরে যাওয়ার জন্য।

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অভিযানকারী একটি দল যাবে পল্টন মোড় থেকে দৈনিক বাংলা হয়ে। অন্য দলটি যাবে নটর ডেম কলেজের মোড় থেকে। তবে অভিযানের পর হেফাজতের কর্মীরা যাতে বঙ্গভবন, কমলাপুর রেলস্টেশন ও আইসিডিতে হামলা চালাতে না পারেন, তাই এসব সড়কের মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয় আগেই। কর্মীদের সরে যাওয়ার জন্য খোলা রাখা হয় টিকাটুলী হয়ে যাত্রাবাড়ীমুখী সড়ক। পরিকল্পনা হয়, সামনে থাকবে র‌্যাব-পুলিশ। পেছনে ভারী অস্ত্র নিয়ে থাকবে বিজিবি। পরিকল্পনামতো, রাত ১২টার মধ্যেই র‌্যাব, পুলিশ ও বিজিবির সদস্যরা রাস্তায় নামতে শুরু করেন। পুরো অভিযান নিয়ন্ত্রণকক্ষে বসে সমন্বয় করছিলেন মহানগর পুলিশ কমিশনার বেনজীর আহমেদ।

প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে চলে অভিযানের বিভিন্ন কৌশল নিয়ে আলোচনা। রাত সাড়ে ১২টার পর থেকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অবস্থান নিতে শুরু করেন। রাত একটায় দুই দিক থেকে এগোতে থাকেন সবাই। আগে র‌্যাব-পুলিশ, পেছনে বিজিবি। সঙ্গে ফায়ার ব্রিগেডের গাড়িবহর। সব বাহিনীর সদস্যদের হাতে, গায়ে বুলেটরোধী পোশাক, হাতে শটগান, গ্যাস নিক্ষেপ করার অস্ত্র আর গ্যাস গ্রেনেড। আছে বিকট শব্দ করে ফেটে যাওয়া সাউন্ড গ্রেনেড, সঙ্গে সাঁজোয়া যান, দাঙ্গা দমনের গাড়ি।

রাত আড়াইটা। মতিঝিল সড়কের আশপাশে শুধুই ধ্বংসযজ্ঞ। র‌্যাব-পুলিশ দৈনিক বাংলা মোড় ছেড়ে এগিয়ে যায় সামনের দিকে। হেফাজতের কর্মীদের সঙ্গে তাদের দূরত্ব তখন মাত্র ১৫-২০ গজ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের দেখামাত্র শুরু হয় উত্তেজনা, চিৎকার-চেঁচামেচি। মাইকে বক্তব্য দিতে শুরু করেন হেফাজতের কর্মীরা। চলে স্লোগান। বক্তারা বলেন, জীবন দিয়ে হলেও অবস্থান ধরে রাখবেন। র‌্যাব-পুলিশের দিকে তাকিয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়ে হাত নেড়ে, হাতের লাঠি দিয়ে সড়কে আঘাত করে চিৎকার করতে থাকেন কর্মীরা।

রাত পৌনে তিনটা। হঠাৎ ঠুসঠাস শব্দ। হেফাজতের কর্মীদের লক্ষ্য করে স্বল্প শব্দের টিয়ার শেল ছুড়ল র‌্যাব-পুলিশ। কিন্তু বিধিবাম। বাতাসে টিয়ার শেলের গ্যাস উল্টো নিজেদের দিকে চলে আসে। দ্রুত পেছনের দিকে সরে যান সবাই। এরপর সাত-আট মিনিটের বিরতি।

রাত তিনটা বাজতে না বাজতেই শুরু হয় মুহুর্মুহু টিয়ার শেল আর সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ। হেফাজতের মাইকে চলে জ্বালাময়ী বক্তব্য। কিন্তু একটি টিয়ার শেল মঞ্চের ওপর পড়ার পরই থেমে যায় মাইকের শব্দ। এরপর চলতে থাকে একের পর এক রাবার বুলেট, গুলি আর কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ। বিকট শব্দে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে চারদিক। যেন যুদ্ধক্ষেত্র। প্রথম ১০ মিনিটের মাথায় হেফাজতের কর্মীরা সরে যেতে শুরু করেন। কেউ চলে যান সোনালী ব্যাংকের ভেতরে, কেউ পাশের ভবনে, কেউ অলিগলিতে। একটি ছোট ঘরে হেফাজতের শ-খানেক কর্মী আশ্রয় নেন। সবাই কিশোর, তরুণ। সবাই বিভিন্ন মাদ্রাসার ছাত্র।

ততক্ষণে পুরো শাপলা চত্বর এলাকা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। কিন্তু, তখনো স্টক এক্সচেঞ্জ-সংলগ্ন এলাকায় চলছিল হেফাজতের কর্মীদের বিক্ষোভ। তাঁরা বিভিন্ন জিনিসে আগুন ধরিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকেন। র‌্যাব-পুলিশ তাঁদের লক্ষ্য করে ছোড়ে টিয়ার শেল। সেখানে পুলিশের এসআই শাহজাহানকে পিটিয়ে খুন করেন হেফাজতের কর্মীরা। কিন্তু সাঁড়াশি অভিযানে আস্তে আস্তে সব ফাঁকা হয়ে যায়।

হেফাজতমুক্ত গভীর রাতের শাপলা চত্বর এলাকা তখন বড়ই অচেনা। চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অসংখ্য লাঠি, জুতা, ব্যাগ, খাবারের প্যাকেট, চিঁড়া, মুড়ি, কাপড়সহ নানা জিনিস। সোনালী ব্যাংকের সামনে একটি প্রাইভেট কার, আছে কাচ ভাঙা, কিছুটা দোমড়ানো-মোচড়ানো। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতেই দেখা গেল রক্তাক্ত এক কিশোর ও এক যুবক। মূল মঞ্চের দিকে পলিথিন মোড়ানো অবস্থায় চার যুবকের লাশ। দিনের বেলায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে মারা যাওয়া কর্মীদের মরদেহ আগেই এখানে মঞ্চের কাছে নিয়ে এসে রাখে হেফাজতে ইসলাম।

এরপর বিভিন্ন ভবনে আশ্রয় নেওয়া হেফাজতের কর্মীদের একে একে বের করে আনা হয়। কেউ বেরিয়ে আসেন কান ধরে, কেউ দুই হাত উঁচু করে। তাঁদের নিরাপদে বের হয়ে বাড়ি চলে যেতে বলা হয়। পুলিশের সদস্য হেফাজতের কর্মীদের বের করতে করতে বলেন, ‘ভাই, চলে যান। আপনারা শান্তিতে থাকেন। দেশটারেও শান্তিতে থাকতেদেন।

About

Comments

comments

সম্পাদক
মফিজুল ইসলাম অলি
ফুলপুর, মোবা: 01712344037

সহকারী সম্পাদক
01. আনছারুল হক রাসেল
হালুয়াঘাট, মোবা: 01750040090
02. শাহ্‌ মোঃ নাফিউল্লাহ সৈকত
ফুলপুর, মোবা: 01711129901

প্রকাশক
রাকিবুল ইসলাম রাকিব
নালিতাবাড়ী, মোবা: 01715560895

বার্তা সম্পাদক
রফিকুল ইসলাম রবি
ধোবাউড়া, মোবা: 01911415636