Thursday, 24/8/2017 | 3:03 UTC+6
দৈনিক বাংলাদেশ

বৈচিত্র্যময় প্রতিভার দূত

আমাদের ছোটবেলায় বাসায় ছিল টুনটুনির বই নামে গল্পের একটি চটিবই। এটি ছিল আমাদের পিঠাপিঠি তিন ভাইবোনের সবচেয়ে প্রিয় বইগুলোর একটি। অন্যগুলোর মধ্যে ছিল আবোলতাবোল, হযবরল, পাগলা দাশু। তখন আমরা এগুলোর লেখকদের ব্যাপারে তেমন জানতাম না। খানিকটা বড় হয়ে জানতে পেলাম টুনটুনির বইয়ের লেখক উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী আর হযবরল ইত্যাদির লেখক সুকুমার রায় পিতা-পুত্র এবং দুজনেই বেশ নামী লেখক। তা ছাড়া আঁকিয়ে হিসেবেও তাঁদের সুনাম আছে আর বইগুলোতে চমৎকার যেসব ছবি রয়েছে, তা লেখকেরা নিজেরাই এঁকেছেন। এভাবে উপেন্দ্রকিশোর নামের সঙ্গে পরিচয় ঘটল, জানলাম বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় তাঁর পৌত্র, সুকুমার রায়ের ছেলে। ক্রমে ক্রমে আরও জানা হলো এ পরিবারের অনেকেই সাহিত্য-শিল্পজগতে কমবেশি খ্যাতিমান। পরিচয় হলো লীলা মজুমদার, সুখলতা রাও, সুবিনয় রায় ও সত্যজিৎ রায়ের লেখার সঙ্গে। বাংলায় ঠাকুর পরিবারের পর উপেন্দ্রকিশোরের পরিবার ছিল দ্বিতীয় নিদর্শন, যেখানে ছিল প্রতিভাবানদের মেলা।

উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বন্ধু ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের চেয়ে বছর দুইয়ের ছোট, জন্ম ১৮৬৩ সালের ১০ মে। বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুও রবীন্দ্রনাথের বন্ধু। বয়সে খানিকটা বড়, জন্ম ১৮৫৮ সালে। রবীন্দ্রনাথের গুণগ্রাহী স্বামী বিবেকানন্দেরও জন্ম ১৮৬৩ সালে। ভাবলে বেশ অবাক হতে হয়, খানিকটা আগে-পিছে এবং ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে হলেও এ চার বাঙালির সবাই জগৎ মাতিয়েছিলেন। আর জগৎজয়ের আয়ুধ তাঁরা অর্জন করেছিলেন নিজ দেশে বসেই, সীমিত সুযোগ-সুবিধাকে অবলম্বন করে। ১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তিরও ১০ বছর আগে ১৮৯৩ সালে শিকাগো ধর্ম মহাসভায় হিন্দুধর্ম বিষয়ে আলোড়ন তোলা বক্তব্য দিয়ে বিশ্বখ্যাতি পান স্বামী বিবেকানন্দ। জগদীশচন্দ্র বসু বেতারযন্ত্র বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার করে বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন ঊনবিংশ শতাব্দীতেই, এর পরবর্তী সময়ে তাঁর আরও আবিষ্কার বিশ্ববিজ্ঞান মহলে আলোড়ন সৃষ্টি করে। কাছাকাছি সময়ে উপেন্দ্রকিশোর তাঁর খুবই সাধারণ মানের লেটারপ্রেস ছাপাখানায় বসে রঙিন ছবি মুদ্রণের যুগান্তকারী উন্নতি ঘটিয়ে পাশ্চাত্যজগৎকে তাক লাগিয়ে দেন। ইউরোপের তখনকার মুদ্রণবিষয়ক সব পত্রিকায় তাঁর প্রশংসাসুলভ নিবন্ধ ছাপা হয়ে তাঁকে মুদ্রণজগতে আন্তর্জাতিক খ্যাতির অধিকারী করে। সে এক আশ্চর্য সময় ছিল বটে।

এ চারজনের সবার মধ্যেই একাধিক প্রতিভার বিচ্ছুরণ দেখা গেছে। তবে বৈচিত্র্যময় বিবিধ প্রতিভার সমাহারে সম্ভবত রবীন্দ্রনাথের পরই উপেন্দ্রকিশোরের স্থান। এ বছর তাঁর সার্ধশততম জন্মবার্ষিকী। জন্ম ময়মনসিংহের অজ-পাড়াগাঁ মসুয়া গ্রামে হলেও বাল্য-কৈশোরের পর উপেন্দ্রকিশোরের জীবন কেটেছে কলকাতাতেই। মাত্র ৫২ বছরের জীবনকালে উপেন্দ্রকিশোরের প্রতিভা বিভিন্ন বিচিত্র বিষয়ে বিকশিত হয়েছে। উপেন্দ্রকিশোরকে বলা যায় ভারতবর্ষে শিশুতোষ রচনার পথিকৃৎ, পুরাণ ও লোককাহিনিকে শিশুদের উপযোগী করে রচনার ক্ষেত্রে এখনো তিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী। টুনটুনির বই ছাড়াও ছেলেদের রামায়ণ, ছেলেদের মহাভারত, গল্পমালা (গুপী গাইন বাঘা বাইনসহ)-এর আবেদন এখনো অম্লান। আরও লিখেছেন ছোটদের উপযোগী বিজ্ঞান ও মহাবিশ্ব বিষয়ে তথ্যসমৃদ্ধ লেখা, যার মধ্যে সেকালের কথা আর আকাশের কথা বিজ্ঞান বিষয়ে শিশুতোষ রচনার উৎকৃষ্ট নিদর্শন। তবে শিশু-কিশোরদের জন্য উপেন্দ্রকিশোরের সবচেয়ে বড় অবদান নিশ্চয়ই ছোটদের পত্রিকা সন্দেশ। ১৯১৩ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়ে থেমে থেমে হলেও সন্দেশ-এর প্রকাশ এখনো অব্যাহত রয়েছে। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও কৌতুকরসের সম্মিলনে তিনি কিশোরচিত্তে সঞ্চার করেছেন জ্ঞান-অন্বেষা ও আনন্দ-উপভোগের এক ভিন্নমাত্রার জগৎ। তাঁর সময় সন্দেশ ছিল সারা ভারতবর্ষে শিশুদের জন্য একমাত্র রঙিন পত্রিকা। পরবর্তীকালে সুকুমার রায়, সত্যজিৎ রায় আর লীলা মজুমদারের মতো পরিবারের খ্যাতিমানদের পরিচালনা ও সম্পাদনায়, মুদ্রণ ও অলংকরণের সৌকর্যে আর লেখার মান ও বৈচিত্র্যে সন্দেশ হয়ে উঠেছে এক কিংবদন্তি।

তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উপেন্দ্রকিশোরের পরিচিতি মূলত মুদ্রণশিল্পে তাঁর মৌলিক অবদানের কারণে। তাঁর নিজস্ব ছাপাখানা ইউ রে অ্যান্ড সন্সকে তিনি তাঁর উদ্ভাবনী শক্তি দিয়ে ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ ছাপাখানায় পরিণত করেছিলেন। এনগ্রেভিং রীতিতে রঙিন আলোকচিত্র মুদ্রণ যখন ইউরোপেও শৈশবাবস্থায় সে সময় এনগ্রেভিং পদ্ধতিতে মুদ্রণপ্রথার দুর্বলতা মোচন আর রঙিন ও হাফটোন ব্লক নির্মাণের ক্ষেত্রে যুগান্তকারী উন্নয়ন ঘটিয়ে তিনি পাশ্চাত্যের মুদ্রণজগৎকে অবাক করে দিয়েছিলেন। তিনি ভারতবর্ষে হাফটোন ব্লকের প্রবর্তন করেন এবং গবেষণার মাধ্যমে এর প্রভূত উন্নতি ঘটান। সম্পূর্ণ দেশীয় উপাদানে গবেষণা করে উপেন্দ্রকিশোর রঙিন মুদ্রণের নানা প্রকার ডায়াফর্ম যন্ত্র, স্ক্রিন অ্যাডজাস্টার যন্ত্র, ডুয়োটাইপ ও টিন্ট প্রসেস পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। তাঁর কৃতিত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁর নাম যুক্ত করে রে-স্ক্রিন অ্যাডজাস্টার ও রে-টিন্ট সিস্টেম নামকরণ করা হয়। তাঁর পরিকল্পনা অনুসরণ করে ব্রিটেনে বাণিজ্যিকভাবে ‘স্ক্রিন অ্যাডজাস্টিং মেশিন’ বানানো হয়। ব্রিটেনের মুদ্রণকলাবিষয়ক অভিজাত পত্রিকা পেনরোজ অ্যানুয়াল ভল্যুম ১৯০৪-০৫ ও ১৯০৫-০৬-এ উপেন্দ্রকিশোরের মুদ্রণবিষয়ক প্রবন্ধ ও তাঁর প্রতি প্রশংসাসূচক সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয়।

সম্পূর্ণ স্বশিক্ষিত হলেও চিত্রাঙ্কনে তাঁর নৈপুণ্য ছিল অসাধারণ। মূলত নিজ রচনার অলংকরণের জন্য অঙ্কনের চর্চা করলেও তেলরং ও জলরং মাধ্যমেও ছবি এঁকেছেন তিনি। রবীন্দ্রনাথের দীর্ঘ কবিতা নদীর জন্য আঁকা সাতটি চিত্রে পশ্চিমা বাস্তবপন্থী রীতিতে উপেন্দ্রকিশোরের পারদর্শিতা অসামান্য। টুনটুনির বই গ্রন্থে তাঁর অলংকরণকে ভারতে শিশুতোষ গ্রন্থ অলংকরণের পথিকৃৎ ও আদর্শ গণ্য করা যায়। সংগীতজগতেও উপেন্দ্রকিশোর আপন প্রতিভায় ভাস্বর। ব্রাহ্মসমাজের একনিষ্ঠ সদস্য হিসেবে সংগীত রচনা ও সুর সৃষ্টি এবং সংগীত বিষয়ে নিবন্ধ প্রকাশ করলেও উপেন্দ্রকিশোরের মূল আকর্ষণ ছিল বাদ্যযন্দ্র। তিনি বাঁশি, পাখোয়াজ ও হারমোনিয়াম বাজানোয় ছিলেন দক্ষ, তবে বেহালাবাদক হিসেবে তৎকালীন কলকাতায় তিনি ছিলেন অন্যতম শ্রেষ্ঠ। তাঁর রচিত সহজ বেহালা শিক্ষা এবং শিক্ষক ব্যতিরেকে হারমোনিয়াম গ্রন্থ দুটি বাদ্যযন্ত্র শিক্ষায় অভিনব রচনা। তাঁর অন্যান্য আগ্রহের মধ্যে ছিল আলোকচিত্র ও গণিতের চর্চা।

উপেন্দ্রকিশোর একদিকে ছিলেন একনিষ্ঠ ধার্মিক ও অধ্যাত্মবাদী, অন্যদিকে তাঁর মন ছিল প্রবলভাবে অনুসন্ধিৎসু ও বিজ্ঞানমনস্ক। ভূমণ্ডল ও তার জীবজগৎ এবং মহাবিশ্বের যাবতীয় রহস্য বিষয়ে তাঁর ছিল অপার কৌতূহল এবং এসব বিষয়ে উত্তর খুঁজেছেন তিনি যুক্তি ও প্রমাণের ভেতরে, অধ্যাত্মবাদে নয়। শিশু ও কিশোরমনের উপযোগী করে যেমন তিনি পুরাণ ও উপকথা রচনা করেছেন তেমনি বিজ্ঞানের নানা তথ্য ও কাহিনিও পরিবেশন করেছেন একেবারে স্বতন্ত্র নিজস্ব এক ভাষায়। ভেবে অবাক হতে হয়, বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের প্রবল আধিপত্য ও তাঁর সঙ্গে ব্যক্তিগত নৈকট্য সত্ত্বেও উপেন্দ্রকিশোরের লেখায় রবীন্দ্রনাথের কোনো প্রভাবই নেই, তাঁর সৃজনজগৎ একেবারেই ভিন্ন মসলায় গড়া।

উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী বাঙালিসমাজের এক শ্রেষ্ঠতম প্রতিভা, যে প্রতিভার ঝলক একটি সময়ে বিশ্ব-বিজ্ঞানের জগৎকে আলোকিত করেছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পর এত বহুমুখী প্রতিভার মানুষ বাঙালিসমাজে আর জন্মায়নি। পরিতাপের হলেও সত্য উপেন্দ্রকিশোর আজ প্রায় বিস্মৃত একটি নাম। অন্তত তাঁর টুনটুনির বই সব বাঙালি শিশুর নির্মল আনন্দের সাথি হওয়ার কথা ছিল, সেটিও হয়নি। তাঁর সার্ধশততম জন্মবার্ষিকীতে আমাদের এই বাংলাদেশের মাটিতে জন্মানো অনন্য প্রতিভার অধিকারী এই মানুষটিকে স্মরণ করার মধ্য দিয়ে আমরা যেন তাঁর কাছে আমাদের ঋণ খানিকটা হলেও শোধ করতে পারি।

About

Comments

comments

সম্পাদক
মফিজুল ইসলাম অলি
ফুলপুর, মোবা: 01712344037

সহকারী সম্পাদক
01. আনছারুল হক রাসেল
হালুয়াঘাট, মোবা: 01750040090
02. শাহ্‌ মোঃ নাফিউল্লাহ সৈকত
ফুলপুর, মোবা: 01711129901

প্রকাশক
রাকিবুল ইসলাম রাকিব
নালিতাবাড়ী, মোবা: 01715560895

বার্তা সম্পাদক
রফিকুল ইসলাম রবি
ধোবাউড়া, মোবা: 01911415636