Thursday, 19/10/2017 | 1:58 UTC+6
দৈনিক বাংলাদেশ

বিশ্বকে আলোকিত করেছেন মহানবী (সা.)

জগদ্বাসীর জন্য প্রশান্তির বার্তা নিয়ে এই মাটির পৃথিবীতে শুভাগমন করেন মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তিনি রহমাতুল্লিল আলামিন তথা সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমত ও করুণার আকর। রবিউল আউয়াল হিজরি চান্দ্রবর্ষের তৃতীয় মাস। আরবি রবি শব্দের অর্থ বসন্তকাল, আউয়াল অর্থ প্রথম; রবিউল আউয়াল অর্থ প্রথম বসন্ত। রবিউস সানি অর্থ দ্বিতীয় বসন্ত বা বসন্তের দ্বিতীয় মাস। সে সময় আরব দেশে রবিউল আউয়াল ও রবিউস সানি—এই দুই মাস মিলে ছিল বসন্তকাল।
সূর্য যেমন বিশ্বলোক আলোকিত করে, তেমনি বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)ও বিশ্বকে আপন মহিমায় অলোকিত করেছেন। সূর্যের আলোকরশ্মি দ্বারা যেমন সব বস্তু শক্তি লাভ করে, তেমনি মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সৌজন্যে সৃষ্টিকুল রহমত ও করুণাপ্রাপ্ত হয়।
৫৭০ খ্রিষ্টাব্দের ২০ এপ্রিল, আজ থেকে প্রায় ১ হাজার ৪৪৬ বছর আগে হজরত মুহাম্মদ (সা.) এই ধূলির ধরায় আগমন করেন। তখন চলছিল আইয়ামে জাহেলিয়াত, অর্থাৎ অন্ধকার যুগ। অজ্ঞানতা, মূর্খতা, কুসংস্কার ও দুর্নীতি-পাপাচারে লিপ্ত ছিল আরববাসী। এ সময় জ্ঞানের আলো নিয়ে, মুক্তির বাণী নিয়ে স্বর্গ থেকে মর্ত্যে নেমে এলেন মানবতার মহান শিক্ষক হজরত মুহাম্মদ (সা.)। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন: ‘তোমাদের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে আলোকজ্যোতি ও মহাগ্রন্থ এসেছে।’ (সুরা-৫ আল মায়িদাহ, আয়াত: ১৫)।
মহানবী এলেন শুক্লপক্ষে, রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখে। পূর্ণিমা শশীর পূর্ণ আলোক আভা নিয়ে আলোকিত করতে বিশ্বজগৎকে। সেই দিনটি ছিল সোমবার। সপ্তাহের মধ্যদিবস, অতি তাত্পর্যময়। নবী করিম (সা.) সোমবার দুনিয়াতে শুভাগমন করেছিলেন। করুণার নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বৃহস্পতিবার রজনীতে পিতা খাজা আবদুল্লাহ (রা.)–এর পৃষ্ঠ থেকে মা আমিনা (রা.)-র উদরে আগমন করেন। তাই এই বৃহস্পতিবার এত তাৎপর্যপূর্ণ ও বরকতময়। বনু হাশিম ও কুরাইশকুলে জন্ম বলে তিনি হাশিমি ও কুরাইশি। তবু তিনি শুধু আরব অথবা কুরাইশদের নন, তিনি মানবতার নবী। আল্লাহ তাআলা বলেন: ‘মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তোমাদের মধ্যে কোনো পুরুষের পিতা নন; বরং তিনি আল্লাহর রাসুল ও সর্বশেষ নবী। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞ।’ (সুরা-৩৩ আহজাব, আয়াত: ৪০)।
এসেছেন তিনি প্রভাতে। সেই বর্বর যুগের পশুসুলভ জীবনাচার ও জুলুম, নিপীড়ন, নির্যাতনের সামাজিক অন্যায়, অবিচার ও অত্যাচারের তমসা থেকে মানবতাকে সভ্যতার আলোর দিকে এগিয়ে নিতে; তিনি ভোরের সমীরণপ্রবাহ সঙ্গে নিয়ে প্রভাত–রবির রক্তিম আভায়, সকালের সূর্যের হাসি হয়ে উষার আকাশে উদিত হলেন মুক্তির দূতরূপে।
কোরআন করিমে ঘোষণা হয়েছে এভাবে: ‘অবশ্যই তোমাদের মধ্য হতেই তোমাদের নিকট এক রাসুল এসেছেন। তোমাদের যা বিপন্ন করে তা তাঁর জন্য কষ্টদায়ক। তিনি তোমাদের মঙ্গলকামী, মোমিনদের প্রতি তিনি দয়ার্দ্র ও পরম দয়ালু। অতঃপর উহারা যদি মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে আপনি বলুন, আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, তিনি ব্যতীত অন্য কোনো ইলাহ নেই। আমি তাঁরই ওপর নির্ভর করি এবং তিনি মহা আরশের অধিপতি।’ (সুরা-৯ তাওবা, আয়াত: ১২৮-১২৯)। তাঁর আগমন ও প্রস্থান একই মাসের, একই তারিখে ও একই বারে। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন: ‘হজরত মুহাম্মদ (সা.) একজন রাসুল; তাঁর পূর্বে বহু রাসুল গত হয়েছেন। সুতরাং যদি তিনি ইন্তেকাল করেন অথবা শাহাদাতবরণ করেন, তবে তোমরা কি পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে? এবং কেউ পৃষ্ঠ প্রদর্শন করলে সে কখনো আল্লাহর ক্ষতি করবে না; বরং আল্লাহ শিগগিরই কৃতজ্ঞদিগকে পুরস্কৃত করবেন।’ (সুরা-৩ আলে ইমরান, আয়াত: ১৪৪)।
তিনি ও তাঁর অনুসারীরা অবিশ্বাসীদের বিষয়ে কঠোর এবং বিশ্বাসীদের প্রতি দয়ার্দ্র। ‘মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রাসুল; তাঁর সহচরগণ কাফিরদের প্রতি কঠোর এবং নিজেদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল; আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনায় আপনি তাদের রুকু ও সিজদায় অবনত দেখবেন। তাদের লক্ষণ তাদের মুখমণ্ডলে সিজদার প্রভাব পরিস্ফুট থাকবে: তাওরাতে তাদের বর্ণনা এই রূপ এবং ইঞ্জিলেও তাদের বর্ণনা এই রূপই। তাদের দৃষ্টান্ত একটি চারাগাছ, যা হতে নির্গত হয় কিশলয়, অতঃপর ইহা শক্ত ও পুষ্ট হয় এবং পরে কাণ্ডের ওপর দাঁড়ায় দৃঢ়ভাবে, যা চাষির জন্য আনন্দদায়ক। এভাবে আল্লাহ মোমিনদের সমৃদ্ধি দ্বারা কাফিরদের অন্তর্জ্বালা সৃষ্টি করেন। যারা ইমান আনে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ক্ষমা ও মহা পুরস্কারের।’ (সুরা-৪৮ ফাত্হ, আয়াত: ২৯)।
যাঁর আগমনের প্রতীক্ষায় বিশ্বের সেরা সেরা নবী-রাসুলেরা অপেক্ষমাণ ছিলেন; যাঁর উম্মত হওয়ার নিমিত্তে অন্যান্য নবী-রাসুলেরা আবেদন করেছিলেন, যাঁর আগমনের সুসংবাদ সব নবী-রাসুল প্রচার করেছিলেন, তিনি মহান প্রভুর সর্বাধিক প্রশংসাকারী ‘আহমাদ’। আহমাদ নামটি কোরআন করিমে এসেছে একবার। আল্লাহ তাআলা বলেন: ‘স্মরণ করো, মারইয়াম–তনয় ঈসা (আ.) বলেছিল, “হে বনি ইসরাইল! আমি তোমাদের নিকট আল্লাহর রাসুল এবং আমার পূর্ব হতে তোমাদের নিকট যে তাওরাত রয়েছে, আমি তার সর্বাধিক সমর্থক এবং আমার পরে আহমাদ নামে যে রাসুল আসবেন, আমি তাঁর সুসংবাদদাতা।’” (সুরা-৬১ সফ, আয়াত: ৬)।
তিনি কামলিওয়ালা। বিশ্ব মানবতার অবিসংবাদিত নেতা হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে তাঁর মহান বন্ধু আল্লাহ রাব্বুল আলামিন নানা অবিধায় অভিহিত করেছেন, বিভিন্ন বিশেষণে বিভূষিত করেছেন, বিবিধ সম্ভাষণে সম্বোধন করেছেন। আহ্বান করেছেন কখনো ‘ত হা’, আবার কখনো ‘ইয়া সীন’। (সুরা-৩৬ ইয়া সীন, আয়াত: ১)। এসবের মাঝে পরিচিত তিনি ‘কামলিওয়ালা’ নবী তথা ‘মুজজাম্মিল’ ও ‘মুদ্দাছছির’। (সুরা-৭৩ মুজজাম্মিল, আয়াত: ১ ও সুরা-৭৪ মুদ্দাছছির, আয়াত: ১)।
মহানবী খোদার মাহবুব, মাশুক ও হাবিব। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন: ‘শপথ দিবালোকের! শপথ রজনীর যখন তিমিরাচ্ছন্ন হয়। আপনার রব আপনাকে ছেড়ে যাননি এবং আপনার প্রতি বিরাগভাজনও হননি। ইহকাল অপেক্ষা পরকাল (বর্তমান থেকে ভবিষ্যৎ) আপনার জন্য শ্রেয়তর। অচিরেই আপনার প্রভু আপনাকে দান করবেন, যাতে আপনি সন্তুষ্ট হন। তিনি পেয়েছেন আপনাকে অনাথ, অতঃপর আশ্রয় দিয়েছেন। আর তিনি পেয়েছিলেন আপনাকে অনুরাগী, তাই হিদায়াতের পথ দেখিয়ে দিয়েছেন। এবং তিনি পেয়েছেন আপনাকে পুনঃপুন ব্রত, তাই দিয়েছেন প্রাচুর্য।’ (সুরা-৯৩ দুহা, আয়াত: ১-৮)।
মহানবীর গুণগান বিশ্বময়। আল্লাহ তাআলা বলেন: ‘আমি আপনার বক্ষ প্রশস্ত করেছি, আমিই আপনার বোঝা নামিয়ে দিয়েছি, যা আপনার পৃষ্ঠ কুঁজো করে দিয়েছিল। আর আমি আপনার সুনাম সর্বোচ্চে উন্নত করে দিয়েছি।’ (সুরা-৯৪ ইনশিরাহ, আয়াত: ১-৪)।
মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী: যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি, সহকারী অধ্যাপক, আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম।

About

Comments

comments

সম্পাদক
মফিজুল ইসলাম অলি
ফুলপুর, মোবা: 01712344037

সহকারী সম্পাদক
01. আনছারুল হক রাসেল
হালুয়াঘাট, মোবা: 01750040090
02. শাহ্‌ মোঃ নাফিউল্লাহ সৈকত
ফুলপুর, মোবা: 01711129901

প্রকাশক
রাকিবুল ইসলাম রাকিব
নালিতাবাড়ী, মোবা: 01715560895

বার্তা সম্পাদক
রফিকুল ইসলাম রবি
ধোবাউড়া, মোবা: 01911415636