Thursday, 19/10/2017 | 2:00 UTC+6
দৈনিক বাংলাদেশ

গণহত্যা অস্বীকারের পেছনে থাকে রাজনীতি

ইরেনে​ ভিক্তোরিয়া মাসিমিনো
ইরেনে​ ভিক্তোরিয়া মাসিমিনো, আর্জেন্টিনার ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি দে লোমাস দে সামোরা’র আইনের শিক্ষক। তিনি গণহত্যার বিচার ও আইন বিষয়ে গবেষণায় নিয়োজিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব জেনোসাইড অ্যান্ড জাস্টিস এবং মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এক জনবক্তৃতায় অংশ নিতে সম্প্রতি তিনি ঢাকায় এসেছিলেন। এ সময় তিনি প্রথমআলোর সঙ্গে গণহত্যার বিচার ও গণহত্যা প্রতিরোধের উপায় নিয়ে কথা বলেন।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কামাল আহমেদ

প্রথম আলো l আপনি গণহত্যাবিষয়ক আইনের বিশেষজ্ঞ। বিশ্বের অন্যান্য গণহত্যার তুলনায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত গণহত্যার অপরাধের মাত্রা আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

ইরেনে​ ভিক্তোরিয়া মাসিমিনো l গণহত্যা বিষয়ে বিশেষভাবে কাজ করার জন্য আমি বিভিন্ন দেশের গণহত্যা সম্পর্কে গবেষণা করেছি। বিশেষ করে বিশ শতকে বিশ্বে ঘটে যাওয়া গণহত্যাগুলোর বিষয়ে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনেক বিষয় উপনিবেশবাদের সঙ্গে সম্পর্কিত। ঔপনিবেশিক ব্যবস্থায় এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে, যার পরিণতিতে পরবর্তী সময়ে গণহত্যা ঘটেছে। বাংলাদেশেও সেই রকম হয়েছে। আমি কোনো গণহত্যাকেই গুরুত্বের দিক থেকে কমবেশি হিসাবে শ্রেণীকরণ করব না। সুনির্দিষ্টভাবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মৃত্যুর সংখ্যা এত বিপুল যে সামাজিক বন্ধন ও জাতীয় পরিচয়ের ক্ষেত্রে তার প্রভাব অন্য দেশগুলোর চেয়ে বেশি। আর্জেন্টিনার কথা বলা যায়। আর্জেন্টিনায় ৩০ হাজার মানুষ নিহত বা গুম হয়েছে। সুতরাং, সংখ্যার নিরিখে তুলনা করা কঠিন। তা ছাড়া সংখ্যার নিরিখে তুলনা করা হলে নিহত প্রতিটি জীবনের অবমূল্যায়ন ঘটে। গণহত্যার শিকার প্রতিটি জীবনেরই গুরুত্ব অনেক বেশি।

প্রথম আলো l বাংলাদেশের গণহত্যার বিষয়ে গবেষণায়

আজ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের খুব একটা আগ্রহ দেখা যায় না। এর কারণ কী?

ইরেনে​ মাসিমিনো l আসল কারণ আমি জানি না। আন্তর্জাতিক পরিসরে গণহত্যার একটা বড় প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে যখন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বিদেশি সরকারগুলোর কিছু স্বার্থের বিষয় থাকে। আমার মনে হয়, বাংলাদেশ যে বাইরের কোনো সহায়তা ছাড়াই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পদক্ষেপ নিয়েছে, সেটাই বাংলাদেশের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আগ্রহী করে তুলেছে। বাংলাদেশ শুধু বিদেশে থাকা অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিষয়ে তদন্তের ক্ষেত্রে বিদেশের সহায়তা চেয়েছে। এ ছাড়া পুরোটাই স্থানীয় এবং নিজস্ব বিচারব্যবস্থা। স্থানীয় বা নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় গণহত্যার বিচার বাংলাদেশ ছাড়া আর যারা করেছে, তারা হলো আর্জেন্টিনা, কম্বোডিয়া ও গুয়াতেমালা। এই দেশগুলো আন্তর্জাতিক কোনো সংস্থার সহায়তা ছাড়া নিজস্ব ব্যবস্থায় যে বিচার করছে, তার কারণ আমরা আমাদের স্বার্থ অন্যদের চেয়ে ভালো বুঝি। আমার মনে হয় সে কারণেই গণহত্যা ও তার সুদূরপ্রসারী প্রভাবের বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ততটা গভীর আগ্রহ দেখায়নি।

প্রথম আলো l বিচারের বিষয়টি সাম্প্রতিক সময়ে ঘটছে। কিন্তু তার আগের প্রায় তিন দশকের বেশি সময়ে আমাদের গণহত্যার বিষয়ে কোনো উল্লেখযোগ্য গবেষণা আন্তর্জাতিক পরিসরে কেউ করেননি, তা তিনি গবেষকই হোন কিংবা কোনো রাজনৈতিক বা অধিকারগোষ্ঠী।

ইরেনে​ মাসিমিনো l এটা একটা লক্ষণীয় বিষয়। আমি সম্প্রতি ফিদেল কাস্ত্রোর শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। একটা বিষয় সেখানে স্পষ্ট দেখা গেল যে বিশ্ব স্পষ্টতই দুই ভাগে বিভক্ত। আমরা যে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অংশ, তার থেকে উন্নত দেশগুলোকে গুরুত্ব বেশিই দেওয়া হয়। সুতরাং, যেসব দেশের গুরুত্ব অতটা নয়, তাদের মৃত্যু, সংগ্রাম, সংঘাত বা পরিবেশের প্রভাব অনেকটাই পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়। সেটাই সম্ভবত ৪৫ বছর আগে ঘটে যাওয়া বাংলাদেশের গণহত্যার গবেষণায় অন্যদের আগ্রহী না হওয়ার কারণ। লাতিন আমেরিকায় আমাদের আর্জেন্টিনার অবস্থান অনেকটা দৃশ্যমান। যে কারণে অন্যদের ওপর তার প্রভাব পড়েছিল এবং আমরা অন্য দেশগুলোর সঙ্গেও একজোট হয়েছি। বাংলাদেশ মনে হয় সেদিক থেকে এখনো কিছুটা বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে, যে কারণে গণহত্যার বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের স্বীকৃতি পেতে এতটা সংগ্রাম করতে হয়েছে।

প্রথম আলো l গণহত্যার শিকার ব্যক্তিদের স্মরণ এবং গণহত্যা প্রতিরোধে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য ৯ ডিসেম্বর একটি আন্তর্জাতিক দিবস পালন করা হয়। গণহত্যাবিষয়ক একটি আন্তর্জাতিক সনদ গৃহীত হয়েছে ৬৮ বছর আগে। অথচ ১৯৭১-এ বাংলাদেশের গণহত্যার প্রতি সহানুভূতি তেমন জোরালো নয়। এটি কি কিছুটা বিস্ময়ের বিষয় নয়?

ইরেনে মাসিমিনো l হ্যাঁ, বিস্ময়কর। তবে একটি মেরুকরণের মধ্য দিয়ে বিভাজিত বিশ্বে এর মানে বোঝা যায়। যেমনটি আমি বললাম, অর্থনৈতিক স্বার্থের বিষয়টি একটি দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটা একটা সমস্যা। অনেক দেশের ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে বৈশ্বিক ক্ষেত্রে দায়মুক্তি বা বিচারহীনতার বিষয়টি থেকে যাচ্ছে। শক্তিধর দেশগুলোর সৃষ্ট মতামতের ওপর এগুলো নির্ভরশীল। আমার মতো লোকদের তাই দায়িত্ব হচ্ছে সত্যটা বিশ্বকে জানানো, ন্যায়বিচারের জন্য তা সবার সামনে তুলে ধরা এবং বাংলাদেশ ও আর্জেন্টিনার মতো অভিজ্ঞতার মধ্যে যোগসূত্র ঘটানো। আমরা গত বছর আর্জেন্টিনায় এ রকম একটি সম্মেলনে অনেককে সমবেত করেছিলাম। বিচারক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা সেখানে বাংলাদেশের গণহত্যার বিচার নিয়ে কথা বলেছিলেন। গণহত্যার বিষয়টি সম্পর্কে জানা ও জানানোর জন্য ব্যক্তিগতভাবে সামাজিক আন্দোলনের অংশ হতে হবে; শুধু শক্তিশালী সরকারগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকলে তা হবে না।

প্রথম আলো l প্রতিবেশী মিয়ানমারে যা ঘটছে, নাগরিক গোষ্ঠীগুলো তাকে গণহত্যা বলে অভিহিত করেছে। কিন্তু জাতিসংঘের সাবেক একজন মহাসচিব এটিকে এখনো গণহত্যা বলতে চান না। কোন কোন বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে এ ধরনের অপরাধকে গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হবে? মনে হচ্ছে দেশভেদে এই বৈশিষ্ট্যগুলো আলাদা?

ইরেনে​ মাসিমিনো l দেখুন, আমার মনে হয় এই বৈশিষ্ট্যগুলোর ভিন্নতা অনেক বেশি। এক গণহত্যাকে স্বীকার করা হচ্ছে, অন্য গণহত্যাকে স্বীকার করা হচ্ছে না। কিন্তু বিষয়টা শেষ পর্যন্ত এই: গণহত্যা সব সময়ই একটা রাজনৈতিক অপরাধ; গণহত্যার সঙ্গে রাজনীতির যোগসূত্র থাকে। জাতিসংঘে যখন গণহত্যা সনদটি গৃহীত হয়, তখনো রাজনৈতিক জোটবদ্ধতার বিষয় ছিল। তখনকার সাক্ষ্য-প্রমাণেরও রাজনৈতিক রূপ ছিল। আর্মেনিয়ার গণহত্যার প্রায় ১০০ বছর পর এই সেদিন কয়েকটা দেশ এটাকে গণহত্যা হিসেবে স্বীকার করেছে। এটা রাজনৈতিক অপরাধ এবং কোনো কোনো দেশ রাজনৈতিক কারণে এটিকে গণহত্যা বলে স্বীকার করে না। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় হিসেবে আমরা যদি গণহত্যাকে স্বীকার না করি, তাহলে এর পুনরাবৃত্তি ঠেকানো সম্ভব হবে না। বস্তুত গণহত্যার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে আমরা বেশি কিছু করতে পারিনি। সে কারণেই প্রতিবছর আমরা নতুন নতুন গণহত্যার কথা শুনছি। ব্যক্তিগতভাবে আমি জাতিসংঘের ওপর খুব একটা আশা রাখি না। কেননা, তারা এ ধরনের ক্ষেত্রে প্রায় সব সময়ই ব্যর্থ হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে যা ঘটছে, তা এখন মধ্যপ্রাচ্যকে ধ্বংস করে ফেলছে। আপনি মিয়ানমারের কথা বলেছেন। মধ্য আমেরিকায় বেশ কয়েকটি সংঘাত চলছে। সৌভাগ্যের বিষয়, দক্ষিণ আমেরিকা শান্তির পথ অনুসরণ করছে। তবে তা কতটা স্থায়ী হবে আমরা জানি না। বাইরের থেকে একধরনের ইন্ধন সব সময়ই আছে। ব্রাজিলে দিলমা রুসেফের অপসারণে সে রকমটি দেখা যাচ্ছে। শক্তিধর দেশগুলোর নানা ধরনের রাজনৈতিক স্বার্থের সংঘাত এবং তৎপরতার কারণে গণহত্যা প্রতিরোধের কাজটি নানাভাবেই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

প্রথম আলো l তাহলে গণহত্যার পুনরাবৃত্তি রোধের উপায় কী?

ইরেনে​ মাসিমিনো l যে দেশে ইতিমধ্যে গণহত্যা হয়েছে, যেমন বাংলাদেশ বা আর্জেন্টিনা, সেখানে পুনরাবৃত্তি রোধের প্রধান হাতিয়ার হচ্ছে গণহত্যার স্বীকৃতি, তার বিচার, অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করা, সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য চেষ্টা করা। সত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা শুধু বিচারের মাধ্যমেই নয়, নাগরিক সমাজের উদ্যোগের মাধ্যমেও। গণহত্যার স্মৃতিটাকে জনগোষ্ঠীর মধ্যে জাগ্রত রাখা, ইতিহাস স্মরণ এবং বৈষম্য দূর করার উপায় উদ্ভাবন। অন্যদের প্রতি বৈষম্য করা হলে তাতে পার্থক্য তৈরি হয় যে বিভেদের একটা নেতিবাচক অনুরণন রয়েছে। এ ধরনের বৈষম্যেই গণহত্যার ক্ষেত্র তৈরি হয়। এগুলোই প্রধান হাতিয়ার। অবশ্য শিক্ষার বিষয়টিও আছে। মানুষকে শিক্ষিত করা, স্কুলে দেশের ইতিহাস শেখানো এবং বিচার–প্রক্রিয়া সম্পর্কে সচেতন করা।

প্রথম আলো l বাংলাদেশের গণহত্যার বিচারের কথা আপনি বলেছেন। এই বিচার নিয়ে বিদেশে বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে। নানা ধরনের প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। কেন এসব প্রশ্ন উঠেছে বলে আপনার মনে হয়?

ইরেনে​ মাসিমিনো l আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রেও এমনটি হয়েছে এবং আগেই আমি সে কথা বলেছি। আপনি যখন আপনার সীমানার মধ্যে কোনো ধরনের বিদেশি সংস্থার হস্তক্ষেপ ছাড়াই বিচার করছেন, ওই সব আন্তর্জাতিক সংস্থার মধ্যে একধরনের ক্ষোভ তৈরি হয়। এখানে পরোক্ষভাবে ঔপনিবেশিকতারও একটা ছাপ থাকে। তারা নানা দেশে যায়, সেখানকার প্রকৃত অবস্থা না জেনে সেখানে নানা ধরনের বাধ্যবাধকতা আরোপের চেষ্টা করে। ওই দেশের ইতিহাস না জেনে তারা যেগুলো চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে, তা অনেকটা পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার ধারায় করে থাকে। এগুলো যে দেশে বিচার হচ্ছে, সেই দেশের সঙ্গে ওই সব সংস্থার একধরনের সংঘাত তৈরি করে। আর্জেন্টিনায়ও একই অবস্থা হয়েছিল। এমনকি দেশের ভেতরের কিছু লোকও বিচারের বিরোধিতা করেছিল। তারাও বলেছিল যে বিচার পক্ষপাতদুষ্ট অথবা বিচার যথাযথভাবে হচ্ছে না। এ ধরনের ইস্যু বিতর্কের জন্ম দেবেই। তবে আমি মনে করি, এ ধরনের বিতর্কের প্রয়োজন আছে। বিতর্কের মধ্য দিয়ে বিচারের বিষয়টি আলোচনায় আসে। এর মাধ্যমে বিচার–প্রক্রিয়া আরও নিয়মনিষ্ঠ হয়, প্রক্রিয়া ঠিকভাবে অনুসরণ করে। ওই সব প্রক্রিয়া অনুসরণ না করা হলে আমরা আরও বেশি সমালোচিত হতাম। আমার মনে হয়, এ রকম বিতর্কের মুখোমুখি হওয়াটাই স্বাভাবিক।

প্রথম আলো l আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

ইরেনে​ মাসিমিনো l আপনাকেও ধন্যবাদ।

About

Comments

comments

সম্পাদক
মফিজুল ইসলাম অলি
ফুলপুর, মোবা: 01712344037

সহকারী সম্পাদক
01. আনছারুল হক রাসেল
হালুয়াঘাট, মোবা: 01750040090
02. শাহ্‌ মোঃ নাফিউল্লাহ সৈকত
ফুলপুর, মোবা: 01711129901

প্রকাশক
রাকিবুল ইসলাম রাকিব
নালিতাবাড়ী, মোবা: 01715560895

বার্তা সম্পাদক
রফিকুল ইসলাম রবি
ধোবাউড়া, মোবা: 01911415636