Thursday, 19/10/2017 | 1:59 UTC+6
দৈনিক বাংলাদেশ

কূটনীতিকের সম্মান বনাম গৃহকর্মীর মর্যাদা

দেবযানী খোবরাগাড়ে নামটি এখন প্রথম আলোর পাঠকদের কাছে বেশ পরিচিত। দেবযানী-কাণ্ডকে ঘিরে পরাক্রমশালী যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘মিত্র’ ভারতের সম্পর্কের টানাপোড়েনের কারণেই এ পরিচিতি। তবে এ ঘটনা একটি জটিল, বহুমাত্রিক বিষয়কে সামনে এনেছে, যা এই ভারতীয় উপমহাদেশের বিচারে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
গৃহকর্মীর সঙ্গে ‘আর্থিক’ লেনদেন যথাযথ না হওয়ার কারণে নিউইয়র্কে ভারতের ডেপুটি কনসাল জেনারেল দেবযানী খোবরাগাড়েকে সন্তানকে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার পথে গ্রেপ্তার, হাতকড়া পরানো, বিবস্ত্র করে তল্লাশি, ডিএনএ সংগ্রহ এবং কারাগারে মাদকাসক্তদের সঙ্গে একই কক্ষে রাখার মতো নিন্দনীয় ঘটনা গোটা ভারতকে ঐক্যবদ্ধ করতে সাহায্য করেছে। সংগত কারণে যুক্তরাষ্ট্রের এই ‘দাদাগিরি’ কোনোভাবেই মানতে পারেননি ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব। তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা হিসেবে সফররত মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সব ধরনের সাক্ষাৎ বাতিল করে দেন ক্ষমতাসীনেরা। দিল্লির মার্কিন দূতাবাসের সামনে থেকে সরিয়ে নেওয়া হয় সব ‘ব্যারিকেড’ এবং বাতিল করা হয় দূতাবাসে কর্মরত মার্কিন কর্মকর্তাদের বিমানবন্দরে ঢোকার বিশেষ পাস। প্রতিবাদের কোরাসে গলা মেলান রাহুল গান্ধী থেকে শুরু করে নরেন্দ্র মোদি পর্যন্ত সর্বস্তরের রাজনীতিকেরা। রাজনৈতিক এই পেশিশক্তির (পড়ুন গলা) ব্যবহারে মুছে যায় ডান-বাম-মধ্য ভেদাভেদ, যা এ দেশে অনেককে এই ভাবনায় ভারাক্রান্ত করে যে ‘জাতীয় স্বার্থে কেন আমরা এমন এক হতে পারি না’! ফেসবুক, টুইটারসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে বয়ে যায় মার্কিনবিরোধিতার সুনামি। প্রথিতযশা একজন সাংবাদিক তাঁর টুইটার বার্তায় লেখেন, ‘দিল্লির মার্কিন দূতাবাসে কোনো সমকামী কর্মকর্তা আছেন কি না, খুঁজে বের করে আমাদের আইন অনুযায়ী বিচার করা হোক।’ এই ভারতীয় ‘অস্মিতা’র লক্ষ্য একটাই, মিত্র যুক্তরাষ্ট্রকে এটা বুঝিয়ে দেওয়া ‘কিল খেয়ে কিল হজম করার দিন শেষ’।
মুদ্রার অপর পিঠ হলো, ভারতীয় বন্ধুদের দাবির মুখে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি দেবযানী-কাণ্ডের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তবে ক্ষমা প্রার্থনা বা দেবযানীর বিরুদ্ধে সব অভিযোগ প্রত্যাহারের ভারতীয় দাবি নাকচ করে দেন মার্কিন কর্মকর্তারা। সে দেশের একজন আইন কর্মকর্তা বলেছেন, দেবযানী তাঁর সঙ্গে দুর্ব্যবহারের যে অভিযোগ করেছেন তা আদৌ সত্য না। বরং ‘আটক’ দেবযানীকে কফি খাওয়ানো থেকে শুরু করে অনেক সুযোগ-সুবিধাই দেওয়া হয়েছে, যা সচরাচর মার্কিন নাগরিকদেরও দেওয়া হয় না। সময়ের পরিক্রমায় দুই বন্ধু দেশের এই অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের তরজা ও উত্তেজনা কিছুটা স্তিমিত হয়ে এসেছে। আদালতে সশরীরে হাজিরা দেওয়া থেকে মুক্তি পেয়েছেন দেবযানী। কিছুটা হাঁফ ছেড়ে সুসম্পর্ক আরও জোরদার করার কাজেই মনোনিবেশ করেছে নয়াদিল্লি ও ওয়াশিংটন।
নিউইয়র্কে দেবযানীর গ্রেপ্তারের ঘটনাটি এই প্রশ্নকে সামনে এনেছে যে, কূটনীতিকদের সুরক্ষা বিধি ভিয়েনা কনভেনশন কি তবে যুক্তরাষ্ট্র মানবে না? না মানলে দেশটির বিরুদ্ধে কিছু করা যাবে না? ১৯৬৩-এর ভিয়েনা কনভেনশনের আর্টিকেল ৪৩-এ বলা হয়েছে, ‘ভয়ঙ্কর অপরাধ এবং যথোপযুক্ত বিচারবিভাগীয় কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত ছাড়া কনসুলার কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তার বা আটক করা যাবে না।’ দেবযানীর বিরুদ্ধে অভিযোগ, গৃহকর্মীকে যে প্রতিশ্রুত বেতনের কথা বলে যুক্তরাষ্ট্রে আসতে সহায়তা করেছিলেন, তা তিনি রাখেননি। এককথায় তিনি ভিসা জালিয়াতির অভিযোগে অভিযুক্ত। কিন্তু এই জালিয়াতি ভয়ংকর অপরাধ কিনা তা নিয়ে বিতর্ক আছে। মার্কিন কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, বিদেশি কূটনীতিকদের সে দেশে আসার আগে যুক্তরাষ্ট্রের আইন মেনে চলার বিষয়টি বারবার স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত করে ভারতীয় গণমাধ্যমে একটা কথা বারবার বলা হচ্ছে, দেবযানীর সঙ্গে যে আচরণ করা হয়েছে তা কি কোনো চীনা বা ইউরোপীয় কূটনীতিকের সঙ্গে করার সাহস দেখাত যুক্তরাষ্ট্র? এ ক্ষেত্রে একটা বিষয় ভুলে গেলে চলবে না, নারী সহকর্মীকে যৌন নিগ্রহের অভিযোগে আইএমএফের সাবেক প্রধান দোমেনিক স্ত্রস কান গ্রেপ্তার হয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রেই। কান যুক্তরাষ্ট্রের পরম মিত্র ফ্রান্সের নাগরিক।
যে দেবযানীকে নিয়ে ভারতের উচ্চবর্গীয় (রাজনীতিক, সংবাদকর্মীসহ) সমাজ এত উচ্চকিত তাঁর অতীত আসলে কী বলে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন সাবেক কর্মকর্তা উত্তম খোবরাগাড়ের মেয়ে দেবযানী চিকিৎসাশাস্ত্রে পড়াশোনা করলেও ব্যবহারিক জীবনে আর ওই পথে হাঁটেননি। ভারতীয় সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা দিয়ে বাবার মতো ‘ফরেন ক্যাডারে’ যোগ দেন ১৯৯৯ সালে। প্রভাবশালী পিতার অদৃশ্য হাত থাকায় এই অল্প সময়ের মধ্যে বিদেশে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ দূতাবাসে নিয়োগ পেয়েছেন। তাঁর চেয়ে মেধা-যোগ্যতায় এগিয়ে থাকা একই ব্যাচের মহাবীর ভি সিংভিকে ডিঙিয়ে জার্মানিতে নিয়োগ পান দেবযানী। কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধাচরণ করার অভিযোগে চাকরি যায় মহাবীরের। শেষ পর্যন্ত আদালতের রায়ে চাকরি ফিরে পান মহাবীর। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এ জন্য আড়াই লাখ রুপি জরিমানাও করেন কেন্দ্রীয় সরকারকে। ব্যক্তিগত জীবনে দেবযানী বিয়ে করেছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন অধ্যাপক আকাশ সিং রাঠোরকে।
এ প্রসঙ্গে মহারাষ্ট্রের আদর্শ হাউজিং সোসাইটির গল্পটা বলা দরকার। সশস্ত্র বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের আবাসনের সুবিধা করে দিতে মুম্বাইয়ের কেন্দ্রস্থলে ‘মহার্ঘ’ জমি পানির দামে বরাদ্দ দিয়েছিল রাজ্য সরকার। এই আবাসন প্রকল্পে একটি কাঙ্ক্ষিত ফ্ল্যাট পেতে কোনো আদর্শের ধার ধারেননি বেশির ভাগ আবেদনকারী। এই কেলেঙ্কারি শেষ পর্যন্ত মুম্বাই হাইকোর্টের তত্ত্বাবধানে তদন্ত করে সিবিআই। এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে তিন কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রীর নাম। এই মান্যবরদের সঙ্গে একই তালিকায় উঠে আসে উত্তম খোবরাগাড়ে ও তাঁর মেয়ে দেবযানীর নাম। নথি থেকে দেখা গেছে, আদর্শ হাউজিংয়ে ফ্ল্যাটের জন্য করা আবেদনে দেবযানী তাঁর বার্ষিক আয় দেখিয়েছিলেন মাত্র এক লাখ ৮০ হাজার রুপি! অথচ ফ্ল্যাটের মূল্য হিসাবে এক বছরে তিনি পরিশোধ করেন এক কোটি ১০ লাখ রুপি। তীব্র জাতীয়তাবাদের আবেগে ভেসে যাওয়া ভারতীয় গণমাধ্যমে এ সব তথ্যও উঠে এসেছে।
আর ‘কাজের লোক’ নিয়ে ভারতীয় কূটনীতিকদের সমস্যা তো নতুন নয়। কিছুদিন আগে নিউইয়র্কের সাবেক ভারতীয় কনসাল জেনারেল প্রভু দয়াল কাজের লোক নিয়ে একই ধরনের সমস্যার মুখে পড়েন, যা আদালত পর্যন্ত গড়ায়। পরে আদালতের বাইরে ৭০ হাজার ডলার দিয়ে মিটমাট করতে হয়। দেবযানীও বিষয়টি জানতেন। এত সব জানা-বোঝা সত্ত্বেও ঘণ্টায় সাড়ে ৯ দশমিক ৭৫ ডলার দেওয়ার কথা বলে কাজের লোককে তিনি দেন ৩০ হাজার রুপি (যা বর্তমানে ৫০০ ডলারেরও কম)। আর দেবযানীর বিরুদ্ধে কাজের লোকের বেতন কম দেওয়ার অভিযোগ তিন মাসের (গত সেপ্টেম্বর) পুরোনো। কিন্তু ‘ক্ষুব্ধ’ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোনো পাত্তাই দেয়নি। সবকিছু ঘটে যাওয়ার পর গেল গেল রব পড়ে গেছে।
আর ‘কূটনীতিক’ দেবযানীকে ঘিরে ভারতীয় ভাবাবেগের যে চিত্রনাট্য রচিত হয়েছে, তার কেন্দ্রীয় চরিত্র সেই ‘কাজের লোক’ সঙ্গীতা রিচার্ডের কথা সবাই বেমালুম ভুলে গেছে। অথচ তিনিও একজন ভারতীয়। এখন সঙ্গীতার নামটাই মুখে আনতে চায় না জাত্যভিমানে আত্মগর্বী উচ্চবর্গীয় ভারতীয় সমাজ। তাদের কাছে ‘প্রতারিত’ সঙ্গীতার কোনো অভিযোগই পাত্তা পায় না কূটনীতিক দেবযানীর কারণে। ভাবখানা এমন যে না হয় কটা টাকাই কম পেয়েছ, তাই বলে বিদেশের মাটিতে এভাবে দেশের নাম ডোবাবে! মার্কিন আইন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার পরও এই উচ্চবর্গীয় সমাজ একবারও বলল না, কাজের লোক সঙ্গীতাকে ঠকিয়ে দেবযানী অন্যায় করেছেন। শ্রেণীতত্ত্বের কুৎসিত রূপ এখানে প্রকাশ্য। সঙ্গীতাকে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর চর বলতেও বাধেনি দেবযানীর বাবার।
শ্রেণীবৈষম্যের এ কথাটাই উঠে এসেছে অনন্যা ভট্টাচার্যের কথায়। নিউইয়র্কে ভারতীয় গৃহকর্মীদের নিয়ে কাজ করা অনন্যা বলেছেন, ‘ভারত সরকার শুধু তার কূটনীতিকের বিষয়টি তুলে ধরছে। এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক যে একবারও তারা গৃহকর্মীর বিষয়টি মুখে আনছে না। আর সুযোগ পেলেই ষড়যন্ত্র তত্ত্ব আওড়াচ্ছে। এটা সেই চিরায়ত সামন্ততান্ত্রিক ভারতের প্রভু-ভৃত্য সম্পর্কের প্রকাশ। এই মানসিকতা কী ভারতে, কী বিদেশে—সর্বত্র বিরাজমান।’
নিউইয়র্ক ল স্কুলের সহযোগী অধ্যাপক চৌমতুলি হকের মতে, ভারত সরকারকে বিষয়টির দিকে মানবিক দৃষ্টিতে তাকাতে হবে। ভোটের বাজারে (মে ২০১৪, লোকসভা নির্বাচন) জাতীয়তাবাদের মাদক বিপণনে ব্যস্ত রাজনৈতিক দলগুলো কি তাঁর এ কথা কানে তুলবেন? মনে হয় না। দিন যাবে, দেবযানীর মামলার গতি শ্লথ হবে। তিনি আরও কূটনৈতিক সুরক্ষার বর্ম নিয়ে জাতিসংঘে ভারতের মুখ আলো করবেন। তরজা থামিয়ে দিল্লি-ওয়াশিংটনের কর্তাব্যক্তিরা বহুমাত্রিক বন্ধুত্বের আবাহনে গলাগলি শুরু করবেন। আর এসবের ভিড়ে হয়তো বা একদিন তলিয়ে যাবে কঠোর মার্কিন আইন। আর সঙ্গীতা রিচার্ড স্বামী-সন্তান নিয়ে নিউইয়র্কের কোনো কানাগলিতে কোনোমতে দিন গুজরান করবেন।

সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া. ইকোনমিক টাইমস ও এনডিটিভি

About

Comments

comments

সম্পাদক
মফিজুল ইসলাম অলি
ফুলপুর, মোবা: 01712344037

সহকারী সম্পাদক
01. আনছারুল হক রাসেল
হালুয়াঘাট, মোবা: 01750040090
02. শাহ্‌ মোঃ নাফিউল্লাহ সৈকত
ফুলপুর, মোবা: 01711129901

প্রকাশক
রাকিবুল ইসলাম রাকিব
নালিতাবাড়ী, মোবা: 01715560895

বার্তা সম্পাদক
রফিকুল ইসলাম রবি
ধোবাউড়া, মোবা: 01911415636